ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে কত টাকা লাগে? বাস, ট্রেন ও থাকার খরচসহ সম্পূর্ণ গাইড

ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে কত টাকা লাগে? বাস, ট্রেন ও থাকার খরচসহ সম্পূর্ণ গাইড

কক্সবাজার মানেই বিশাল নীল জলরাশি আর অনন্ত আকাশের এক অপূর্ব মিলন। শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু ছুটি নিয়ে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের সামনে দাঁড়ালে ঢেউয়ের শব্দেই মন ভালো হয়ে যায়। অনেকেই মনে করেন ভরা মৌসুমে কক্সবাজার গেলে খরচ ও ভিড় দুটোই বেশি সামলাতে হয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা থাকলে পিক সিজনেও বাজেটের মধ্যে কক্সবাজার ঘোরা সম্ভব।

ঢাকা থেকে কক্সবাজার ভ্রমণ গাইড

এই গাইডে ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার উপায়। থাকার ব্যবস্থা। খাবারের খরচ। সমুদ্রে নামার আগে সতর্কতা এবং জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হলো।

সূচিপত্র

ঢাকা থেকে কক্সবাজার কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে কক্সবাজার সড়কপথে দূরত্ব প্রায় ৪১৪ কিলোমিটার। বাসে যেতে সাধারণত ৭ থেকে ১০ ঘণ্টার মতো সময় লাগতে পারে। যানজট এবং রাস্তার পরিস্থিতির কারণে সময় কমবেশি হতে পারে।

সায়েদাবাদ। কলাবাগান কিংবা কল্যাণপুরের বিভিন্ন কাউন্টার থেকে কক্সবাজারের বাস পাওয়া যায়।

নন এসি বাসে ভাড়া প্রায় ৯০০ থেকে ১১০০ টাকা এবং এসি বাসে প্রায় ১৩০০ থেকে ২২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বাসের ধরন ও পরিবহনভেদে ভাড়ায় পরিবর্তন হতে পারে। ২০২৬ সালের সংশোধিত বিআরটিএ ভাড়া তালিকাতেও ঢাকা কক্সবাজার রুটের ভাড়ায় বাসের আসন ও ধরন অনুযায়ী পার্থক্য রয়েছে।

চাইলে সরাসরি ট্রেনেও কক্সবাজার যেতে পারেন। ট্রেনে যেতে প্রায় ৮ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। বর্তমানে এই রুটে বিভিন্ন শ্রেণির টিকিটের দামও আলাদা। তাই ভ্রমণের আগে বর্তমান ভাড়া ও সময়সূচি দেখে টিকিট করা ভালো।

কক্সবাজারে কোথায় থাকবেন

কক্সবাজারে থাকার জন্য কলাতলী। সুগন্ধা এবং লাবণী পয়েন্টের আশেপাশে অসংখ্য হোটেল রয়েছে। কানেক্টিং রুম। কাপল রুম কিংবা ফোর বেড রুমসহ বিভিন্ন ধরনের রুম পাওয়া যায়।

সিজন অনুযায়ী হোটেল ভাড়ায় বেশ পার্থক্য দেখা যায়। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত পিক সিজনে একটি কানেক্টিং রুমের ভাড়া প্রায় ৫০০০ থেকে ৫৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। একই ধরনের রুম অফ সিজনে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে।

প্রিমিয়াম সি ভিউ বা ফ্যামিলি রুমের ভাড়া ৭০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে হোটেলভেদে দাম পরিবর্তন হয়। সরাসরি হোটেলে যোগাযোগ করলে অনেক সময় ভালো ডিসকাউন্টও পাওয়া যায়।

ভরা মৌসুমে ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই হোটেল বুকিং করে রাখা ভালো।

সকালের নাস্তা থেকে দুপুরের খাবার

সকালে হোটেলের কাছাকাছি লোকাল রেস্টুরেন্টে জনপ্রতি প্রায় ৬০ টাকার মধ্যেই নাস্তা সেরে নেওয়া যায়।

দুপুরের খাবারের জন্য ভাত। ডাল। ভর্তা এবং তরকারির প্যাকেজ সাধারণত জনপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। তবে বিচের আশেপাশের কিছু রেস্টুরেন্টে খাবারের দাম তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

তাই বাজেটের মধ্যে খেতে চাইলে খাবারের অর্ডার দেওয়ার আগে দাম জেনে নেওয়াই ভালো।

সমুদ্রে নামার আগে যা জানা দরকার

সুগন্ধা বা লাবণী বিচের প্রবেশপথের আশেপাশে লকার সুবিধা পাওয়া যায়। সেখানে মোবাইল। টাকা এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিস রেখে সমুদ্রে নামতে পারেন।

লকারের ভাড়া সাধারণত ঘণ্টায় প্রায় ৪০ টাকা অথবা একবারে ৫০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে হতে পারে। স্থানভেদে এই দাম পরিবর্তন হতে পারে।

যারা ঢেউয়ের সঙ্গে একটু বেশি সময় পানিতে থাকতে চান তারা সৈকত থেকে টিউব ভাড়া করে নিতে পারেন। সমুদ্রে নামার আগে জোয়ার ভাটার সময় জেনে নেওয়াও ভালো।

জেটস্কি। স্পিডবোট এবং ঘোড়ায় চড়ার খরচ

সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার জন্য জেটস্কি ও স্পিডবোটে চড়ার সুযোগ রয়েছে। জেটস্কির ভাড়া প্রায় ৫০০ টাকা থেকে শুরু হতে পারে। তবে সময় ও সার্ভিস অনুযায়ী দাম পরিবর্তন হতে পারে।

সৈকতে ঘোড়ায় চড়ার অভিজ্ঞতাও বেশ মজার। তবে এখানে একটু সতর্ক থাকা জরুরি। অনেক সময় ২০০ টাকা নিয়ে মাত্র কয়েক মিনিট ঘুরিয়েই ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তাই ঘোড়ায় ওঠার আগে কতক্ষণ ঘোরানো হবে এবং মোট কত টাকা দিতে হবে তা পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।

সৈকতে ছবি তোলার সময় সতর্ক থাকুন

কক্সবাজারের সৈকতে অনেক প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার ছবি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। ছবি তোলার আগে কয়টি ছবি দেওয়া হবে এবং প্রতিটি ছবি বা পুরো প্যাকেজের দাম কত তা পরিষ্কারভাবে জেনে নিন।

আগে থেকেই দাম ঠিক করে নিলে পরে বাড়তি টাকা চাওয়ার মতো অপ্রত্যাশিত ঝামেলা এড়ানো যায়।

মেরিন ড্রাইভ ধরে হিমছড়ি ও প্যারাসেইলিং পয়েন্ট

সুগন্ধা বা কলাতলী থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে সিএনজি কিংবা চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করে ইনানি পর্যন্ত ঘুরে আসা যায়।

একটি সিএনজি সাধারণত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার জন্য প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে রিজার্ভ করা সম্ভব হতে পারে। তবে গাড়ি ও সময় অনুযায়ী ভাড়ায় পরিবর্তন হতে পারে।

পথে পড়বে হিমছড়ি পাহাড়। এখানে প্রবেশমূল্য দিয়ে উপরে উঠলে সমুদ্রের দারুণ একটি ভিউ দেখা যায়।

এরপর রয়েছে প্যারাসেইলিং পয়েন্ট। এখানে জেটস্কি। স্পিডবোট এবং প্যারাসেইলিংয়ের মতো বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার রাইড পাওয়া যায়।

প্যারাসেইলিংয়ে সাধারণত দুটি প্যাকেজ থাকে। শুধু আকাশে ওড়ার প্যাকেজে খরচ প্রায় ২০০০ টাকা এবং সাগরের পানি ছুঁয়ে আকাশে ওঠার প্যাকেজে প্রায় ২৫০০ টাকা লাগতে পারে।

রাইড নেওয়ার আগে বর্তমান মূল্য এবং প্যাকেজের সময় জেনে নেওয়া ভালো।

ইনানি বিচ ও সূর্যাস্ত

ইনানি বিচ কলাতলী বা সুগন্ধা বিচের তুলনায় অনেকটাই শান্ত এবং কোলাহলমুক্ত। ভাটার সময় এখানে প্রবাল পাথর জেগে ওঠে যা দেখতে অনেকটা সেন্ট মার্টিনের মতো লাগে।

যারা একটু নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটাতে চান তাদের জন্য বিকেলের ইনানি বিচ হতে পারে দারুণ একটি গন্তব্য। এখান থেকে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতাও অসাধারণ।

পাটোয়ারটেক ও রেজুখাল এলাকায় সতর্কতা

মেরিন ড্রাইভ ধরে যাওয়ার পথে রেজুখালের কাছে থামলে ক্যাকিং করা যায় এবং আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

পাটোয়ারটেক এলাকায় রাস্তার পাশে টোল বা চাঁদার মতো টাকা দাবি করার ঘটনা নিয়ে পর্যটকদের মধ্যে সতর্কতার কথা শোনা যায়। তাই কোনো টাকা দেওয়ার আগে সেটি সরকারি বা বৈধ ফি কি না যাচাই করে নেওয়া ভালো।

রাতের কক্সবাজার ও কেনাকাটা

সন্ধ্যার পর লাবণী ও সুগন্ধা বিচের আশেপাশে জমে ওঠে বিশাল শপিং মার্কেট। এখানে শামুক ঝিনুকের শোপিস। গয়না। বার্মিজ আচার এবং শুঁটকিসহ নানা ধরনের জিনিস পাওয়া যায়।

রাতের কক্সবাজারের পরিবেশ দিনের তুলনায় একেবারেই আলাদা। সৈকতের আশেপাশে হাঁটাহাঁটি এবং রাতের বাজার ঘুরে দেখাও ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে।

সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ ও ফ্রাই

সুগন্ধা পয়েন্টের আশেপাশে ফুটপাতের ধারে তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ ও ফ্রাই পাওয়া যায়।

এক কেজির বেশি ওজনের স্থানীয় সেলমন বা তাইল্লা মাছ প্রায় ৬০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। টুনা মাছের দাম কেজিতে প্রায় ৭৫০ টাকা এবং চিংড়ি বা লবস্টারের দাম কেজিতে প্রায় ২২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

কাঁকড়া সাধারণত পিস হিসেবে বিক্রি হয় এবং আকার অনুযায়ী দাম প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা হতে পারে।

তবে মাছের দাম এবং প্রাপ্যতা সময় ও বাজারভেদে পরিবর্তন হতে পারে। তাই কেনার আগে দাম জেনে নেওয়া এবং প্রয়োজনে কিছুটা দরদাম করে নেওয়া ভালো।

শেষ কথা

কক্সবাজার ভ্রমণে মোট খরচ অনেকটাই নির্ভর করে আপনার পরিকল্পনা। থাকার ব্যবস্থা এবং কী ধরনের সার্ভিস নিচ্ছেন তার ওপর।

আগে থেকে হোটেল বুকিং করা। যাতায়াতের সঠিক মাধ্যম বেছে নেওয়া এবং সৈকতে বিভিন্ন সার্ভিস নেওয়ার আগে দাম পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া। এই কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলে ভরা মৌসুমেও বাজেটের মধ্যে কক্সবাজার ভ্রমণ করা সম্ভব।

সঠিক পরিকল্পনা থাকলে কক্সবাজার শুধু একটি সমুদ্রভ্রমণ নয়। বরং পরিবার। বন্ধু কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো দারুণ একটি স্মরণীয় ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আনিক ট্রেন্ড নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url